স্ট্যাট খুঁজে দেখেন বনাম পাড়লে মাঠে এসে খেলেন- বাংলাদেশ ক্রিকেটে তামিম সংকট- ১ম পর্ব

 স্ট্যাট খুঁজে দেখেন বনাম পাড়লে মাঠে এসে খেলেন- বাংলাদেশ ক্রিকেটে তামিম সংকট- ১ম পর্ব


গত ১০ মে ২০২১ ডেইলি স্টার তামিম ইকবালের একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টালে।  সেখানে স্ট্রাইক রেট এবং তামিমের ব্যাটিং এপ্রোচ নিয়ে সাংবাদিক প্রশ্ন তুললে তামিম সরাসরি হাইরোড দেখিয়ে দেন, “Go check the stats.” তামিমের সামর্থ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে গিয়ে স্ট্যাট চেক করুন।

একসময়ের নিয়মিত ক্রিকেট দর্শক হিসেবে তামিমের ধ্বজভঙ্গ ব্যাটিং দেখে যারপরনাই হতাশ এবং বিরক্ত ছিলাম। তামিম ক্রিজে থাকাকালীন পাড়লে খেলা না দেখে থাকতাম, না হয় ফেসবুক চালাতাম। যারা নিয়মিত ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দেখেন তারা মাত্রই জানেন বাংলাদেশের ক্রিকেট কোন মধ্যযুগে পড়ে রয়েছে। আর সিনিয়র সিন্ডিকেটের হোতা তামিম এর পেছনের অন্যতম খলনায়ক।

গত ২ বছর ধরে তামিমের এই অক্রিকেটিয় রূপ, বয়সের ভারে দৌড়াতে না পারা, ৩০ বল খেললেই হাঁপানি রোগির মত হাঁসফাঁস করা যখন আস্তে আস্তে লোকজনের চোখে ধরা পড়তে শুরু করেছে- মানুষ যখন প্রশ্ন করা শুরু করেছে- সাংবাদিক যখন সরাসরি প্রশ্ন করেছেন- তাখন তামিম বলে দিলেন, স্ট্যাট ঘেটে দেখুন! তামিমের এই কথা আমার কাছে ‘পাড়লে মাঠে এসে খেলে দেখান’- এই উক্তিরই অন্যরূপ।

চলুন ‘স্ট্যাট ঘেটেই’ তামিমের ভূত ঝেড়ে নামানো যাক।

বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শক বলতেই জানেন ২০১৫ সাল বাংলাদেশ দলে আমূল পরিবর্তন আনে। এই বছর থেকেই আপনাদের ভাষায় ধারাবাহিক এবং তামিমের সেরা ফর্ম, আমার ভাষায় কচ্ছপ গতির তামিমের ব্যাটিং দেখতে পাই। আমার স্ট্যাট এনালাইসিস ১ জানুয়ারি ২০১৫ সাল থেকেই শুরু করব। কেবল ওডিআই এবং কেবলমাত্র ওডিআই নিয়েই আলোচনা করব।


২০১৫ সাল থেকে ২০২১ পর্যন্ত তামিম খেলেছেন ৭৮ টি ইনিংস। ৫০ গড়ে করেছেন ৩৪৮১ রান, সেঞ্চুরি ৯ টি। এই স্ট্যাট টুকু দেখে মনে হবে তামিম বর্তমান ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। ওপেনার হিসেবে থাকবে রোহিত শর্মা, ডেভিড ওয়ার্নারদের কাতারে। এমন মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের কতিপয় সাংবাদিকগণ এসবই প্রচার করেন। তাহলে চলুন সর্ষের ভেতরের ভূত খুঁজে বের করা যাক।

আমি প্রত্যেকটা দলের বিপক্ষে তামিমের পারফর্মেন্স তুলে ধরব। অধুনিক ক্রিকেটের মেইন ফ্যাক্টর ডমিনেন্স, স্ট্রাইকরেট এবং দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা। এই প্যারামিটার তথা আধুনিক ক্রিকেটের ছাঁচে তামিম ইকবালকে বিশ্লেষণ করা হবে।

 

তামিম vs আস্ট্রেলিয়াঃ

২০১৫ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশ মাত্র দুইটি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পেয়েছে। দুটিতেই ওপেনার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল খান। দুই ম্যাচে ৭৮ গড়ে(!) করেছেন মোট ১৫৭ রান। ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ৯৫ এবং ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে ৬২ রান। এইটুকু দেখে আমাকে হয়তো গালমন্দ করা শুরু করে দিয়েছেন। এখন আসুন শুভঙ্করের ফাঁকিটা দেখি-

২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ম্যাচে তামিম খুব ভাল ব্যাটিং করেছে। দলের অন্যান্য প্লেয়াররা যেখানে ক্রিজে টিকতেই পারছিলেন না সেখানে তামিম একাই করেছেন ১১৪ বলে ৯৪ রান। স্ট্রাইকরেট ৮৩। দলের এই অবস্থায় হয়তো বলবেন তামিম খুব ভাল ব্যাটিং করেছে। ১১৪টা বল কাজে লাগিয়ে ৯৫ রান অনেক। এবার ধরুন অন্য প্রান্ত থেকে সাকিব, মুশফিক খুব ভাল ব্যাটিং করছে, স্পোর্টিং পিচ। ৩০০+ রান হতেই হবে। তাহলে কী তামিমের ব্যাটিং এ চোখে পরার মত কোন উন্নতি হত? নাকি তিনি এই ১০০ বল খেলার পরেও ৮৩ স্ট্রাইকরেটেই ব্যাট চালিয়ে যেতেন? উত্তরটা আপনারাই খুঁজুন।

দুঃখজনক ভাবে বৃষ্টির কারণে সেই ম্যাচে কোন ফলাফল হয়নি। তবু যতটুকু খেলা হয়েছে সেখানে ওয়ার্নার করেছেন ৪৪ বলে ৪০ রান স্ট্রাইকরেট ৯০। স্টিভ স্মিথ করেছেন ২৫ বলে ২২ রান, স্ট্রাইকরেট ৮৮। এবার তামিমের খেলার সাথে এই দুইজনের খেলার তুলনাটা করে দেখুন।

এবার আসি ২০১৯ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চে। বাংলাদেশী বোলারদের অসাধারণ নৈপুণ্যে বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৩৮২ রানের টার্গেট। জিততে হলে ওভার প্রতি দরকার ৭.৬২ রান। দেশ সেরা ওপেনার তামিম শুরু করলেন তার স্বভাবসুলভ ধীর গতির মন্থর ব্যাটিং। সৌম্য সরকার ৮ বলে ১০ রান করে রান আউটের শিকার হলে ক্রিজে আসেন সাকিব আল হাসান। এসেই স্ট্রাইক রোটেট করে বলে বলে রান তুলছিলেন, কখনো স্ট্রাইকরেট ১০০’র ওপরে। এদিকে তামিম করেছেন ৩৫ বলে মাত্র ২২ রান, স্ট্রাইকরেট ৬২। সাকিব আউট হয়ে যাওয়ার পর মুশফিকও সাকিবের পথ অনুসরণ করলেন। এদিকে আমাদের দেশ সেরা ওপেনার ৬৫ বলে ওনার ব্যক্তিগত অর্ধশতক পূর্ণ করলেন। স্ট্রাইকরেট ৭৬। আবার বলছি ৩৮২ রান চেজ করতে গিয়ে দলের ওপেনার ৬৫ বলে খেলে ৭৬ স্ট্রাইকরেটে করেছেন মাত্র ৫০ রান। ম্যাচ ওখানেই শেষ। এরপর মুশফিক কী করল, রিয়াদ কীভাবে ব্যাটিং করল তা আর জানার দরকার নেই। ম্যাচ সেই প্রথম ১৫ ওভারেই শেষ হয়ে গেছে। বাকি ছিল ফরমালিটি।

যদি এমন হত তামিম ৫০ বলে ৬৫ করত- দলে যুক্ত হত ১৫টি মূল্যবান রান এবং হাতে থাকত ১৫টি বল। বাংলাদেশ সেদিন ৪৮ রানের ব্যবধানে হেরেছিল। তখন দরকার হত ১৫ বলে ৩৩ রান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের যুগে খুবই সম্ভব। হাতে ১৫ টি বল এবং ওপেনিং এ উড়ন্ত সূচনা থাকলে হয়তো ম্যাচের ফলাফলটা অন্যরকম হতে পারত।


তামিম VS ইন্ডিয়া

ইন্ডিয়ার সাথে তামিমের স্ট্যাট খুব আহামরি কিছু না। ৬ ম্যাচে মাত্র ১৯৫ রান, গড় ৩২, স্ট্রাইকরেট ৭৯। শুধু স্ট্রাইক রেট আর গড়ের দিকে তাকালেই তামিমের দৈন্যদশা চোখে পড়ে। তবে দুটি ৫০ প্লাস ইনিংস আছে। যার মধ্যে ২০১৫ সালে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম ম্যাচ, যেই ম্যাচ বাংলাদেশ জিতেছিল মুস্তাফিজের একক নৈপুণ্যে। তামিমের ৬০ রানের খুব একটা ক্রেডিট দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ অপর প্রান্তে ছিলেন সৌম্য সরকার, মাত্র ৪০ বলে করেছেন ৫৪ রান, স্ট্রাইকরেট ১৩৫। দলের জন্য টিউন তিনিই সেট করে দিয়েছেন।

অন্য ম্যাচটি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে, সেখানে ৮২ বলে ৭০ রান। স্ট্রাইকরেট ৮৫, মোটামুটি মানের ব্যাটিং, এক্সট্রা অরডিনারি কিছু না। কিন্তু দলের অন্য ব্যাটসম্যানেরা যেভাবে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছে তাতে তামিমের এই ৭০ রানের ইনিংস একটি মহাকাব্য। অন্তত বাংলাদেশী দর্শকদের চোখে তাই।

এই ম্যাচে বাংলাদেশ শোচনীয় ভাবে হেরেছিল। সেকেন্ড ইনিংসে খেলতে নেমে ওপেনার রোহিত শর্মা করেন ১২৩ রান, স্ট্রাইকরেট ৯৫- শিখর ধাওয়ান করেন, ৩৪ বলে ৪৬ রান, স্ট্রাইকরেট ১৩৫। এই দুইজনের খেলার ধরণ তামিমের জন্য বড় শিক্ষা। পিচকে কোনভাবেই দোষ দেওয়া যাবে না। দোষ যেটুকু সব ব্যাটসম্যানদেরই নিতে হবে।

বাকি চার ম্যাচে তামিমের রান যথাক্রমে, ২৫, ১৩, ৫ এবং ২২। স্ট্রাইকরেট যথাক্রমে, ১০০, ৬১, ৬২ এবং ৭০। অর্থাৎ ৬ ম্যাচে মাত্র ২টি ইনিংসে স্ট্রাইকরেট হেলথি, একটিতে মধ্যযুগ বাকি তিনটিতে প্রাচীন যুগের ক্রিকেট। তামিম এই প্রাচীন যুগের ক্রিকেট খেলতেই বেশি ভালোবাসেন। অন্তত বড় দল গুলোর বিপক্ষে। 


তামিম vs ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তামিম ম্যাচ পেয়েছে ৬ টি। মোট রান মাত্র ২২৫, এভারেজ ৩৭, স্ট্রাইকরেট মাত্র ৫৮। বাংলাদেশের মত মিডিওকার দলের জন্যও এভারেজ ইমপ্রেসিভ হলেও স্ট্রাইকরেট জঘন্য।

আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। ইংল্যান্ডের সাথে ৬ মাচের মধ্যে তামিম শুধু একটিতেই ৫০ এর ঘর পেড়ুতে পেড়েছেন। করেছেন টপ টায়ার টিমের বিপক্ষে একমাত্র সেঞ্চুরিও। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেই ম্যাচটিতে তামিম করেছিলেন ১৪২ বলে ১২৮ রান, স্ট্রাইকরেট ৯০। বাংলাদেশ দল করেছিল মোট ৩০৫ রান।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৮ রান করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বড় ব্যাপার। কিন্তু আরেকটু গভীর ভাবে চিন্তা করি। দলের ওপেনার ৫০ অভারের মধ্যে ২৩.৪ ওভার বা ১৪২টি বল খেলে করেছেন মাত্র ১২৮ রান, করেছেন ৪৫ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং! যেখানে দলের অন্যান্য ৭ ব্যাটসম্যান মিলে ১৫৮ বল খেলে করেছে ১৭৭ রান। সৌম্য সরকার বাদে সবার স্ট্রাইকরেট ৯৫ এর উপরে।

দলের মেইন ব্যাটসম্যান ওপেনার, যে কিনা সবচেয়ে বেশি বল খেলার সুযোগ পেয়েছেন, ছিলেন ইনিংসের শেষ পর্যন্ত তিনি কিনা করেছেন মাত্র ১২৮ রান। যার ধীর গতির ব্যাটিংয়ের কারণে বাংলাদেশকে ৩০৫ রান করতে হয়েছিল। সাব্বির রহমান ১৬০ স্ট্রাইকরেটে ব্যাট না করলে সেটাও হত কিনা সন্দেহ! চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মত স্পোর্টিং উইকেটে যেখানে ৩৩০ প্লাস রান সিম্পল। যেখানে শুধু তামিমের ধীর গতির সেলফিশ ইনিংসের কারণে দল ৪০ রান কম করেছে।

এখন যদি একটু ইংল্যান্ডের ব্যাটিং এর দিকে তাকাই- অ্যালেক্স হেলস ৯৬ রান, স্ট্রাইকরেটে ১১০- রুট ১৩৩* রান, স্ট্রাইকরেটে ১০৩, মরগান ৭৫* রান স্ট্রাইকরেট ১২২। এটাই আধুনিক যুগের ক্রিকেট।

বাকি ৫টা ম্যাচে তামিমের পারফর্মেন্স যাইচ্ছেতাই!

২০১৫ বিশ্বকাপ ২ রান ৭ বল স্ট্রাইকরেট ২৮

২০১৬ হোম সিরিজ ১৭ রান ৩১ বল স্ট্রাইকরেট ৫৪ (টার্গেট ৩০৯ রান!)

২০১৬ হোম সিরিজ ১৪ রান ৩১ বল স্ট্রাকরেট ৪৫

২০১৬ হোম সিরিজ ৪৫ রান ৬৮ বল স্ট্রাইকরেট ৬৬

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ১২৮ রান ১৪২ বল স্ট্রাইকরেট ৯০

২০১৯ বিশ্বকাপ ১৯ রান ২৯ বল স্ট্রাইকরেট ৬৫

মোট রান ২২৫, এভারেজ ৩৭, স্ট্রাইকরেট মাত্র ৫৮!


আমার এই তামিম বন্দনা চলবে আসন্ন শ্রী লংকা সিরিজের আগ পর্যন্ত। আগামী পর্বে থাকবে নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা এবং পাকিস্তান দলের বিপক্ষে তামিম।


Post a Comment

Previous Post Next Post